সেলিম আহমেদ ঈশ্বরদী থেকে।: ব্যাপক সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও বন্ধ পড়ে আছে পাবনার ঈশ্বরদী বিমানবন্দর। অথচ দীর্ঘদিন থেকে এটি চালুর দাবি জানিয়ে আসছেন এখানকার ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীরা। জানা যায়, পাকিস্তান আমলে বিমানবন্দরে বিমান চলাচল শুরু হয়। এরপর ঈশ্বরদী বিমানবন্দরটি ১৮ বছর ধরে বন্ধ ছিল। পরে গত ২০১৩ সালের ৩০ অক্টোবর আবার বিমানবন্দরটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। ওই সময় তৎকালীন বিমান ও পর্যটনমন্ত্রী ফারুক খান বলেছিলেন, ঈশ্বরদী থেকে আর কখনো ফ্লাইট চলাচল বন্ধ হবে না। কিন্তু সেই ঘোষণার সাড়ে ছয় মাস পর ২০১৪ সালের ২২ মে হঠাৎ বিমান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এরপর আর চালু হয়নি।

স্থানীয়রা মনে করেন, নির্মাণাধীন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ও ইপিজেডের কারণে ঈশ্বরদী বিমানবন্দর ঘিরে সম্ভাবনার নতুন দ্বার উন্মোচন হয়েছে। রাশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিক, দেশি-বিদেশি ক্রেতা-বিক্রেতা ও কর্মকর্তারা বিমানবন্দরটি চালু হলে সুবিধা পাবেন। এ ছাড়া ঈশ্বরদীতে বাংলাদেশ সুগারক্রপ গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ ডাল গবেষণা ইনস্টিটিউট, কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঈশ্বরদী সেনানিবাস, বাংলাদেশ রেলওয়ের বিভাগীয় কার্যালয়সহ অর্ধশতাধিক জাতীয় ও গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের সহজ যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে ঈশ্বরদী বিমানবন্দর। শুধু ঈশ্বরদী নয়, পাবনা, নাটোর, কুষ্টিয়া, সিরাজগঞ্জসহ আশপাশের ব্যবসায়ীরাও বিমানবন্দরের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। যাত্রী এবং এয়ারলাইনস ব্যবসায়ী উভয়েই লাভবান হবেন। পাশাপাশি সরকারের রাজস্ব আয় বাড়বে বলে মনে করছেন তারা। এ ছাড়া জেলায় বেশ কিছু আধুনিক আবাসিক হোটেল ও রিসোর্ট রয়েছে। বিমানবন্দরটি চালু হলে রিসোর্টকেন্দ্রিক যাত্রীও আসা-যাওয়া শুরু হতে পারে।
জানা গেছে, পাবনার ঈশ্বরদী থেকে ঢাকার দূরত্ব ১৭৫ কিলোমিটার। ঢাকা-আরিচা হাইওয়ে ধরে এ পথ পাড়ি দিতে ছয় থেকে সাত ঘণ্টা সময় লাগে। অপরদিকে পশ্চিম রেলওয়ের বিভাগীয় কার্যালয় ঈশ্বরদীর পাকশীতে। এখান থেকে বেশ কয়েকটি ট্রেন নিয়মিত ঢাকায় যাতায়াত করে। ট্রেনে সময় লাগে ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা। বাস ও ট্রেনে প্রতিদিন কয়েক হাজার মানুষ ঢাকায় যাওয়া-আসা করেন।
দীর্ঘদিন থেকে বিমান কেন্দ্রিক যাত্রীদের টিকিট কেনা-বেচা করে ঈশ্বরদীর সরকার এয়ার এক্সপ্রেস অ্যান্ড ট্রাভেলস। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক শাহান শাহ আলমগীর বাবু বলেন, রূপপুর প্রকল্প ও ইপিজেডে বিদেশিদের সংখ্যা অনেক। এদের অধিকাংশই বিমানে চলাচলে আগ্রহী। এ ছাড়া স্থানীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও ব্যবসায়ী মিলিয়ে ঈশ্বরদীতে পর্যাপ্ত যাত্রী রয়েছে। আগে ঢাকা থেকে ঈশ্বরদী হয়ে রাজশাহীতে দুটি বিমান চলাচল করত। এখন রাজশাহীতে পাঁচটি বিমান চলাচল করে। বিমান চলাচল শুরু হলে রাজশাহীর মতো ঈশ্বরদীতে যাত্রীর অভাব হবে না।
ঈশ্বরদীর বিশিষ্ট শিল্পপতি আলহাজ্ব খাইরুল ইসলাম বলেন, ব্যবসা ও বিনিয়োগ অনেকটা যোগাযোগ ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। ঈশ্বরদীর যোগাযোগ ব্যবস্থার সঙ্গে এখানকার বিমানবন্দরটি যুক্ত হলে দেশি-বিদেশি শিল্পোদ্যোক্তারা বিনিয়োগে আগ্রহী হবেন বলে আমি মনে করি। আমরা চাই ঈশ্বরদীতে দ্রুত বিমানবন্দর চালু করা হোক।
বাংলাদেশ সুগারক্রপ গবেষণা ইনস্টিটিউট ( বিএসআরআই )'র মহাপরিচালক (ডিজি) ড. কবির উদ্দিন আহমেদ বলেন, ঈশ্বরদী পাবনা জেলার সমতুল্য একটি গুরুত্বপূর্ণ উপজেলা। বন্ধ থাকা বিমানবন্দরটি চালু হলে এখানকার গুরুত্ব আরও বেড়ে যাবে। আরও সমৃদ্ধ হবে অর্থনীতি। তাই বন্ধ না রেখে বিমানবন্দরটি চালু করা দরকার।
এ প্রসঙ্গে রূপপুর প্রকল্পের প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও সাইট অফিসের ইনচার্জ রুহুল কুদ্দুস বলেন, এই প্রকল্পে কর্মকর্তা, প্রকৌশলীসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে পাঁচ হাজারের বেশি রাশিয়ান নাগরিক কর্মরত আছেন। মন্ত্রণালয়সহ প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট কাজের জন্য তাদের অনেকের যাওয়া-আসা সড়ক পথে হয়। সড়ক পথে ঢাকায় যাতায়াতে তাদের অনেক সময় নষ্ট হয়। বিমান চালু হলে তাদের এ অসুবিধা হতো না। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের সুবিধার্থে ঈশ্বরদী বিমানবন্দর চালু হওয়া দরকার।
ঈশ্বরদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বলেন, আমি কয়েকবার বিমানবন্দর ভিজিট করেছি। ঈশ্বরদী পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে দেশি-বিদেশি কয়েক হাজার মানুষ কর্মরত রয়েছেন। এছাড়া বাংলাদেশ সুগারক্রপ গবেষণা ইনস্টিটিউট, আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউ, ইপিজেড এবং বড় মাপের অনেক ব্যবসায়ী ও শিল্পপতি রয়েছেন। তাদের যাতায়াতের জন্য বিমানবন্দরটি চালু করা বিশেষ প্রয়োজন। ঈশ্বরদীর রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও সুশীল সমাজের দায়িত্ব রয়েছে। বিমানবন্দরটি চালুর জন্য আমি সার্বিক সহযোগিতা করবো।
0 Comments