সেলিম আহমেদ, ঈশ্বরদী (পাবনা) সংবাদদাতা ॥ ঈশ্বরদী উপজেলাসহ গোটা দেশে মৃত্তিকা শিল্পে চলছে দুর্দিন। এক সময় মৃত্তিকা শিল্পের কদর ছিল দেশ জুড়ে। এখন আর কেউ মৃত্তিকা শিল্পের দিকে ঘুরে তাকায় না। অনাহারে-অর্ধাহারে কাটে মৃত্তিকা শিল্পের সাথে জড়িত কারিগর ও শ্রমিকদের। অনেকে বাপ দাদার পৈত্রিক ব্যবসা মনে করে ধরে আছে এই ব্যবসা। নতুন ভাবে এই মৃত্তিকা শিল্পে কেউ আসছেনা। অনেকে বাপ-দাদার এই পেশাকে ছেড়ে অন্য পেশায় যোগ দিয়েছে। বিশেষ করে তরুণেরা বেশির ভাগ এই পেশা ছেড়ে রিকসা, ভ্যান, ভুটভুটি চালক হয়েছে। কেউ বা কৃষি কাজে এবং নির্মাণ শ্রমিকের কাজ করে সংসার চালাচ্ছে।

যেমনি বেড়েছে শ্রমিকের মূল্য তেমনি মাটি ও খড়ির মূল্য বেড়েছে। অনেক আগে দেখা যেত প্রতিটি বাড়িতে মাটির তৈরি কোন না কোন জিনিস রয়েছে। বর্তমানে শতকরা এক-দুই বাড়িতে পাওয়া মুশকিল। প্লাষ্টিক, এ্যালুমিনিয়াম, সিরামিক, তামা, কাঁসা, পিতল, কাঁচ ও ষ্টিলের বাজারে টিকতে পারছেনা মৃত্তিকা শিল্পের আসবাব পত্র। মাটির তৈরি জিনিস ভেঙ্গে যায় এবং সেই সাথে বর্তমান সমাজে খাপ খাইয়ে চলা দায়।
রহিম উদ্দিন নামের ৯৬ বছর বয়স্ক ব্যক্তি জানান, মাটির তৈরি হাড়ির রান্না এ্যালুমিনিয়াম, তামা, পিতল বা ষ্টিলের পাত্রের চাইতে খাবার হয় সুস্বাদু। তিনি আরও বলেন ছোটবেলা দেখেছি মাটির তৈরি জিনিসের কত কদর। পালদের পরিবারে ছিল স্বচ্ছতা আনন্দে কাটতো সংসার জিবন। বর্তমানে পালদের অবস্থা খুব খারাপ শোচনিয় অবস্থা। অনাহারে-অর্ধাহারে কাটে তাদের দিন। পুষ্টিহীনতায় ছেলে-মেয়েরা রোগে শোকে ভুগছে। পড়াশুনা থেকে ওরা বঞ্চিত তিন বেলা খাবার জোটেনা পড়াশুনা করাবে কিভাবে।
সরেজমিনে পাল পরিবারের করুন চিত্র দেখলে চোখে জল চলে আসে। ঈশ্বরদী উপজেলার আড়ামবাড়িয়া ও মুলাডুলির এই দুটি পালপাড়া রয়েছে। এখন তারা গরু খাওয়ানো চারি, পায়খানার পাট, ফুলের টব,দইয়ের নাড়ি, সারা, মাটির ব্যাংক যত সামান্য তৈরি করে থাকেন।

মৃত্তিকা শিল্পের মালামাল বিক্রেতা অসিত কুমার পাল বলেন, এখন সকলেই ব্যাংক কিংবা সমিতি করে তাই মাটির ব্যাংকে টাকা রাখেনা। সে কারণে খুব কম চলে। তিনি বলেন, বৈশাখ এলে কিছু মাটির সানকি বিক্রি হয়। এছাড়া বাকি সময় দোকানে অলস পড়ে থাকে এসব মাটির সামগ্রী।
ঈশ্বরদী আড়ামবাড়িয়া পালপাড়ায় সরেজমিনে গেলে তাদের করুন চিত্র ফুটে ওঠে। অনিল কুমার পাল (৭৪) জানান, বাপ-দাদার পেশা তাই ধরে রেখেছি। মাটির কাজ আগের মতো নেই। সেই সাথে মাটির অনেক মূল্য বেড়েছে আগে নদী থেকে মাটি এনে কাজ করেছি।

তিনি আরও বলেন, এখন কেউ নতুন ভাবে এই পেশায় আসছে না। দইয়ের নাড়ি, গরু খাওয়া চারি, ফুলের টব, পায়খানার পাট বেশি চলে। পালপাড়ার অবস্থা অনেকাংশে খারাপ, আধুনিকতার সাথে খাপ খাইয়ে চলা মুশকিল।
সাঁড়া ইউনিয়ন পরিষদের সচিব শহিদুল ইসলাম বলেন, এই ইউনিয়নে উপজেলার সবচেয়ে বেশি পালদের বসবাস ছিলো। নদী ভাঙ্গনের কারণে তারা বিভিন্ন এলাকায় চলে গেছে। এক সময় আড়ামবাড়িয়ার তৈরি মাটির সামগ্রী দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্রি হতো। আধুনিকতার কাছে মাটির তৈরি সামগ্রী পাত্তা পাচ্ছেনা। মাটির তৈরি এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। তানাহলে অচিরেই বিলুপ্ত হয়ে যাবে।
সেলিম আহমেদ
ঈশ্বরদী প্রতিনিধি
মোবাইল ০১৭১১-১০৮৭৯০
0 Comments